সংবর্ধনার মুখে পেচ্ছাপ...
ঋত্বিক ঘটকের এই কাহিনিটা আমার শোনা। বহুদিন আগে। চরিত্রের নাম কিছু ভুলেছি। তবে ঘটনাটা মনে আছে।
বলেছিলেন দুলেন্দ্র ভৌমিক। আনন্দলোক পত্রিকার তদানীন্তন সম্পাদক এবং নামজাদা সাহিত্যিক। রসিকজন।
ছবির নাম মনে করতে পারছি না।নয় 'সুবর্ণরেখা' অথবা 'তিতাস একটি নদীর নাম'। প্রথমটা মুক্তি পায় ১৯৬৫ সালে। তিতাস ১৯৭৩ এর ছবি।
যতদূর মনে হচ্ছে ঘটনাটা 'সুবর্ণরেখা' ছবিকে কেন্দ্র করে। যাইহোক, সেই ছবি মুক্তির পর একটি সংস্থা ঋত্বিক ঘটককে সংবর্ধনা দিতে চেয়েছিল। ঋত্বিক ঘটক রাজি হন। ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলে সভার আয়োজন হয়েছে।
গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়েছেন। সভায় হাজির ছিলেন নীরদ সি চৌধুরী। সেই বছরই তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়, 'দ্য কন্টিনেন্ট অফ সার্স'। সেই উপলক্ষে কলকাতা এসেছিলেন কিনা জানি না। হয়তো তাই!
মঞ্চে আসীন কবি সাহিত্যিক চলচ্চিত্র সাংবাদিক এবং কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
হলের দ্বারের দুই ধারে মাটির কলস। তাতে কলা গাছ। মঙ্গল ঘট। দ্বার সজ্জিত ফুলে।
দ্বার প্রস্তুত। কিন্তু যাঁর জন্য, তিনি তখনও আসেননি। যোগাযোগের কোনও রাস্তা নেই। উপায়ও নেই। ঋত্বিক ঘটককে যাঁরা আনতে গিয়েছিলেন, তাঁদেরও পাত্তা নেই।

দুলেন্দ্র ভৌমিক বলছেন,
"এদিকে তো স্টেজে উসখুস শুরু হয়েছে। সূর্যাস্তর সময় হয়ে এল। ঘরে-ঘরে, বারে-বারে বাতি জ্বলতে শুরু করেছে। কোথায় ঋত্বিকবাবু! এরপর তো হাত বেঁকে যাবে!
তখনই বাইরে হইচই। একটা টানা রিক্সা এসে থামল। তার ওপর আধশোয়া অবস্থায় ঋত্বিকদা। যাঁরা তাঁকে আনতে গেছিলেন, পিছনে ছুটতে ছুটতে আসছেন।
সাবধানে রিক্সা থেকে নামানো হল। ধরেধরে মঞ্চে ওঠানো হল। মঞ্চের মাঝখানে তক্তপোষ পাতা। তার ওপর সাদা চাদর তাকিয়া।
মঞ্চের পাশে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরা কয়েকটি মেয়ে। হাতে চন্দনের থালা।
ঋত্বিক ঘটক বসতেই ঘোষক মাইক ধরলেন। মেয়েরা গুটিগুটি চন্দন পরাতে লাগল। ঋত্বিক ঘটকের সংবর্ধনা পর্ব চলল খানিকক্ষণ।
প্রথম বক্তা জলদমন্দ্র রবে মানপত্র পাঠ করলেন। গোটা হল করতালিতে ভরে গেল। এরপর ঋত্বিক ঘটককে কিছু বলার জন্য আহ্বান করা হল।
"ব্যাচধারী ভলান্টিয়ার ঋত্বিকদাকে হাত ধরে মাইকের সামনে দাঁড় করাল।"
দিলীপ চা নিয়ে আনন্দলোকের দফতরে ঢুকলো। সবাইকে চা দিল। দুলুদা মানে, দুলেন্দ্র ভৌমিক চায়ে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরালেন।
তারপর?
সবাই একযোগে প্রশ্ন করল।
দুলুদা সিগারেটে একটা লম্বা টান দিলেন। "এদিকে তো ঋত্বিকদা মাইক ধরে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছেন না। একবার স্টেজের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। হাসলেন। তারপর দর্শকদের দিকে মুখ ফেরালেন। হাসলেন। পিনপতনশব্দশ্রবণ নীরবতা।
ঋত্বিকদা আবার হাসলেন। বললেন, 'সংবর্ধনা! চন্দনের ফোঁটা, চাদর, সুধী! সংবর্ধনা দিচ্ছ, হ্যাঁ, সংবর্ধনা! শালা। বীণা হলে আমার ছবি রিলিজ করেছে। একটাও টিকিট বিক্রি হয়নি। এখান থেকে বীণা হেঁটে যেতে গেলে দশ মিনিট লাগে। সংবর্ধনা দিচ্ছ! মালা চন্দন সুধী! ওদিকে হলে মাছি তাড়াচ্ছে। তোমাদের সংবর্ধনার মুখে পেচ্ছাপ করি। শালা।'
"বলে ঋত্বিকদা ছরছর করে পেচ্ছাপ করে দিলেন। হইহই রইরই কাণ্ড! কে কোথায় পালাবে দিশা পাচ্ছে না! স্টেজের ওপরে হুটোপুটি লেগে গেছে! এ এদিকে ছুটছে তো ও ওদিকে। লাল পাড় সাদা শাড়ির মেয়েরা লজ্জায় কে কোথায় পালিয়েছে।
"হঠাৎ দেখি, স্টেজের ওপরে পাতা তক্তপোষের তলা দিয়ে স্রোতের মতো জল গড়াচ্ছে। চাদর তুলে উঁকি মেরে দেখি শক্তিদা। নিচে ঢুকে হিসি করছেন।"
দুলুদা আর একটা সিগারেট ধরালেন।
"সংবর্ধনা সভা তো লণ্ডভণ্ড। পরের দৃশ্য, পরপর তিন চারটে টানা রিক্সা টুনঠুন করতে করতে চলেছে। রিক্সার ওপর ঋত্বিকদা, নীরদ সি চৌধুরী, শক্তিদা আরো যাঁরা সভায় ছিলেন।"
আর আপনি!
দুলুদা বললেন, "আমার কপালে রিক্সা জোটেনি। আমি পিছন পিছন দৌড়চ্ছি।"
রিক্সা সব যাচ্ছে কোথায়!
"বারদুয়ারি।" বললেন দুলুদা।
বেঁচে থাকাকালীন ছবিগুলো চললে, হয়তো আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন।
বেঁচে থাকার দিনগুলোতে সাহচর্য পেলে হয়তো সাধ হত আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার।
বেঁচে থাকাকালীন সমাজ ও রাজনীতি ওঁর আকাঙ্খিত হলে হয়তো চাইতেন কিছুদিন থাকতে।
বেঁচে থাকার সময়ই তাঁর 'পার্টি' পথভ্রষ্ট না হলে হয়তো আরও কিছুটা পথ হাঁটতেন।
কিছুই তো হল না!
আজ ৪ নভেম্বর। ঋত্বিক ঘটকের ১০০ বছর। আমার শতকোটি প্রণাম।
আমার প্রণাম এই মানুষটাকে। যাঁর একটা কথায় আমার বাবা এক কথায় চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। বেছে নিয়েছিলেন থিয়েটার, গান। এক ইপ্সিত, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তাই আমার বাবারও কিস্যু হল না।
আর আমার তো দশায় মশা, বরাবর।
বাল্মীকি চট্টোপাধ্যায়